বেচে দিচ্ছেন ছেলেরা বাবার স্মৃতি

সত্তর বছরের বেশ সময় ধরে রুপোলি ইতিহাসের গর্ভগৃহ আর কে স্টুডিও বিক্রির পথে৷ ঐহিত্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি বেচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন বিখ্যাত কাপুর পরিবারের বর্তমান উত্তরাধিকারীরা৷

মহারাষ্ট্রের চেম্বুরে ১৯৪৮ সালে রাজ কাপুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আর কে স্টুডিও ৷ একই সঙ্গে আর কে ফিল্মসের ব্যানারে তৈরি হতে শুরু করে একের পর এক কালজয়ী সিনেমা৷ সেই শুরু, তার পর দশকের পর দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি চলে এসেছে৷ কাপুর পরিবারের বর্তমান উত্তরাধিকারী তথা অভিনেতা ঋষি কাপুর, রণধীর কাপুর ও তাদের বংশজরা ঠিক করেছেন আর নয় এবার স্টুডিও বিক্রি করে দিতেই হবে৷

মুম্বইয় মিররকে ঋষি কাপুর জানিয়েছেন, “কিছুদিনের আগেও আমার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে আর কে স্টুডিওকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে বাস্তবটা হল ফিনিক্স থেকে নতুন করে ছাই ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। আমরা কাপুরদের এবিষয়টির উপর ভীষণ আবেগ কাজ করে। তবে সত্যিটা হল এই আর কে স্টুডিও কে নতুন করে গড়ে তোলায় জন্য যে পরিমান টাকা বিনিয়োগ করতে হবে পরবর্তীকালে এটা থেকে ততটা লাভ হবে না।

বিশ্বাস করুন, আমাদের অনেক ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এমনকি আর কে স্টুডিওতে আগুন লাগার আগেও এটি আমাদের কাছে একটা বড় সাদা হাতি পোষা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। খুব কম সিনেমা, সিরিয়ালের জন্যই এই স্টুডিওটা ভাড়া করা হত। অথচ এটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার খরচ হচ্ছে অত্যন্ত বেশি।”

আর কে স্টুডিও বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে আরও একটি কারণ রয়েছে যেটা হল এই স্টুটিওটি যে জায়গায় রয়েছে, যেখানে কোনও চিত্র নির্মাতাই আর সিনেমার শ্যুটিং করতে চান না। অথচ ৪ ও ৫ এর দশকে সেরা চিত্রনির্মাতা মনমোহন দেশাই, দেবানন্দ, নবকেতন ফিল্মসের তরফে চেম্বুরের এই আর কে স্টুডিও ভাড়া নেওয়া হত, সেসময় রাতে শ্যুটিংয়ের জন্যই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হত।

পাশাপাশি কাপুর পরিবারের প্রসঙ্গে ঋষি কাপুর বলেন, “বর্তমানে আমাদের কাপুরদের ভাইবোনেরদের মধ্যে একটা ভীষণ ভালো সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের মধ্যেও সেটা যে চিরকাল বজায় থাকবে কিনা কে বলতে পারে? ওখানে আরও অনেক শিল্প রয়েছে, শুধু স্টুডিওটিরই এই পরিণতি হচ্ছে।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝামেলা হলেও আইনজীবী মোটা টাকা নিয়ে তার সমাধান করেন। শুধু স্টুডিওরই এই পরিণতি হয়। আপনার কী মনে হয়, আমার বাবা যদি থাকতেন তিনি কি মেনে নিতে পারতেন যে তাঁর ভালোবাসা পরিশ্রম দিয়ে তৈরি এই জিনিসটার এই পরিণতি হচ্ছে? এটা তো সত্যি এর সঙ্গে বহু স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।”

প্রসঙ্গত, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ‘সুপার ডান্সার’ রিয়েলিটি শোয়ের শ্যুটিংয়ের সময় এই আর কে স্টুডিওতে বিধ্বংসী আগুন লাগে। সেময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাপুর পরিবারের ঐতিহ্যবাহী আর কে স্টুডিওটি।

কাপুর পরিবার, মুম্বই ফিল্ম ইন্ডিস্ট্রির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়়িত রয়েছে এই আর কে স্টুডিও। ঋষি কাপুর, রণধীর কাপুরের বাবা রাজ কাপুর ১৯৪৮ সালে এই আর কে স্টুডিও তথা আর কে ফিল্মসের প্রতিষ্ঠা করেন। আগ (১৯৪৮) বরসাত (১৯৪৯), আওয়ারা (১৯৫১), বুট পলিস, জাগতে রহো, শ্রী৪২০, পরবর্তীকালে জিস দেশ মে গঙ্গা বহতে হ্যায় (১৯৬০) মেরা নাম জোকার (১৯৭০) ববি (১৯৭৩) সহ অসংখ্যা জনপ্রিয় সুপার হিট ছবি আর কে ফিল্মসের প্রযোজনায় তৈরি হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন আর কে ফিল্মসের ব্যানারে আর কোনও ছবি নির্মিত হয়নি। শেষবার ১৯৯৯ সালে ‘আ আব লট চলে’ সিনেমাটি বানিয়েছিলেন ঋষি কাপুর নিজেষ ব্যস ওই পর্যন্তই তারপর আর আর কে ফিল্মসের ব্যানারে কোনও ছবি তৈরি হয়নি। শুধুমাত্র কিছু সিরিয়াল, রিয়েলিটি শোয়ের শ্যুটিংয়ের জন্যই এই আর কে স্টুডিও ভাড়া নেওয়া হত।

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পরেই এই স্টুডিও থেকে তৈরি হয়েছিল ‘আগ’ ছবি৷ স্বাধীনোত্তর ভারতে সেই ছবি প্রবল আলোড়ন ছড়ায়৷ এছাড়াও একের পর এক সুপারহিট সিনেমা তৈরি করা হয়েছে আর কে স্টুডিও-তে৷ ১৯৫১ সালে আওয়ারা, তার পরে পরে শ্রী ৪২০, বুট পালিশ, জাগতে রহো জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সামাজিক আলোড়ন তৈরি করে৷ জিস দেশ মে গঙ্গা বহেতি হ্যায়, ববি, রাম তেরি গঙ্গা মইলি সহ বহু ছবি তৈরি হয়েছে এখানেই৷

কবে নাগাদ এই স্টুডিও বিক্রি হচ্ছে? ঋষি কাপুর বলেন, ‘তা এখনই বলা সম্ভব নয়। বিক্রির ব্যাপারে আলোচনা মাত্র শুরু হয়েছে, অবশ্যই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’